
ঝালকাঠিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভায় তৃণমূলের ক্ষোভ
‘আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা পুনর্বাসিত, বঞ্চিত বিএনপির ত্যাগীরা’ – এমপি জীবা আমিনা
এস এম রেজাউল করিম, ঝালকাঠি : দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের পর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও ঝালকাঠিতে দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা মূল্যায়িত হচ্ছেন না—এমন অভিযোগ উঠেছে দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায়। বরং আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে সম্প্রতি জেলা জজ আদালতে সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগকে কেন্দ্র করে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে সভায় বক্তারা জানান।
মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) ঝালকাঠি শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এসব অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন যারা দলের দুর্দিনে মাঠে ছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
জেলা বিএনপির সভাপতি আ্যাডভোকেট সৈয়দ হেসেনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সরকারি সহকারী ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার। বিশেষ অতিথি ঝালকাঠি-২ আসেনর সংসদ সদস্য ইশরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেনের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এজাজ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক খোকন মল্লিক, পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল হাসান, জেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আলম ও অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মুবিনসহ আরও অনেকে।
দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বক্তব্য রাখেন। বক্তারা মূলত দলের বর্তমান নেতৃত্বের উদ্দেশে তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ তুলে ধরেন।
সভায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জীবা আমীনা আল গাজী বলেন, “আপনারা নির্যাতিত ছিলেন, আমিও নির্যাতিত হয়েছি। ১৮ বছর আমরা সবাই নির্যাতিত হয়েছি। যা শুনছি এবং দেখছি, আসলে এটা দুঃখের বিষয়।”
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন হচ্ছে, জাতীয় পার্টি পুনর্বাসন হচ্ছে, কিন্তু বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা কোথাও ঠাঁই পাচ্ছেন না। দল ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু সুবিধা ভোগ করছে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা—এটা হতে দেওয়া যায় না।”
ঝালকাঠিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা অবহেলিত হচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দলের জাতীয় কমিটির সভায় নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জীবা আমীনা আল গাজী আরও বলেন, দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করছেন, আওয়ামী লীগের ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের কাজ দেওয়া হচ্ছে, অথচ বিএনপির কাউকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
সম্প্রতি ঝালকাঠি জেলা জজ আদালতে সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ হোসেন এবং পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাসিমুল হাসানকে সরকারি আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে এমন ব্যক্তিদের পদায়ন করা হয়েছে, যারা দলের দুঃসময়ে পাশে ছিলেন না।
এ ধরনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে দলের দুর্দিনে কোনো কর্মীকে কাছে পাওয়া যাবে না। এটা আর সহ্য করা হবে না।”
দলের দুঃসময়ের কথা স্মরণ করে জীবা আমীনা বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা মারধর, নির্যাতন, গাড়ি ভাঙচুর, জেল-জুলুমসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। কিন্তু বিগত ১৭ বছরের আন্দোলনে যাদের কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি, তারা এখন কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছেন—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, “জাতীয় পার্টি-আওয়ামী লীগ মাথার ওপর নাচবে, এটা সহ্য করা হবে না। এ বিষয়ে দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমি নিজে কথা বলব এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগের কথা তুলে ধরব।”
সভায় বক্তব্য দেওয়া অন্যান্য নেতাকর্মীরাও একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে যারা মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন, দল ক্ষমতায় আসার পর তারাই এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিপরীতে অতীতে আওয়ামী লীগ কিংবা জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন অনেকেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
নেতাকর্মীরা বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে সুবিধাবাদী ও অনুপ্রবেশকারীদের গুরুত্ব দেওয়া হলে তৃণমূলে হতাশা তৈরি হবে। এতে দলের সাংগঠনিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে সভায় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা যায়। তাদের দাবি, ঝালকাঠি জেলা জজ আদালতে সম্প্রতি সরকারি তিনজন পাবলিক প্রসিকিউটর, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ও সহকারী সরকারি আইন কর্মকর্তা, জিপিও এজিপি পদে ২৭জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলেও দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের অনেকেই সেখানে বাদ পড়েছেন।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, যারা দীর্ঘদিন বিএনপির পক্ষে আইনি লড়াই করেছেন এবং রাজনৈতিক মামলায় দলের নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। এ ঘটনায় দলের তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বক্তারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে। দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও আন্দোলনের মূল্যায়ন না হলে ভবিষ্যতে দলের জন্য কঠিন সময়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা কঠিন হবে।
প্রধান অতিথি ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী নেতা-কর্মীদে