তৃণমূল থেকে জলবায়ু আন্দোলনে: আরিফুর রহমান শুভর এক দশকের পথচলা
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার প্রত্যন্ত তিমিরকাঠি গ্রাম। নদী, খাল আর সবুজে ঘেরা এই জনপদেই বেড়ে ওঠা আরিফুর রহমান শুভর। ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে টিফিনের টাকা জমিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই তাঁকে নিয়ে গেছে স্বেচ্ছাসেবা, যুব নেতৃত্ব, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং জলবায়ু আন্দোলনের পথে।
২০০০ সালের ৭ জুলাই তিমিরকাঠি গ্রামে জন্ম শুভর। শৈশব থেকেই চারপাশের মানুষের সংকট তাঁকে ভাবাত। তবে তাঁর জীবনে পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে ভাবনার বড় একটি বাঁক আসে ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর।
সিডরের ক্ষত থেকে জলবায়ু ভাবনা
সিডরের সময় শুভর বয়স খুব বেশি ছিল না। কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়টির ভয়াবহতা, মানুষের ঘরবাড়ি হারানো, জীবিকার ক্ষতি এবং একটি দুর্যোগ কীভাবে পুরো জনপদের স্বাভাবিক জীবন বদলে দিতে পারে—এসব তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে।
নিজের চোখের সামনে মানুষের জীবন ও প্রকৃতির এই বিপর্যয় তাঁকে বুঝতে শেখায়, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পাঠ্যবই বা আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় নয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের কাছে এটি প্রতিদিনের জীবন, জীবিকা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
এই উপলব্ধি থেকেই ধীরে ধীরে পরিবেশ, দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে তরুণেরা কীভাবে নিজেদের এলাকার সমস্যা বুঝবে এবং সমাধানের উদ্যোগে যুক্ত হবে—সেই ভাবনা তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে ওঠে।
কয়েকজন তরুণের উদ্যোগ থেকে ইয়ুথনেট গ্লোবাল
২০১৬ সালে কয়েকজন উদ্যমী তরুণকে সঙ্গে নিয়ে শুভ শুরু করেন যুব নেতৃত্বাধীন প্ল্যাটফর্ম ইয়ুথনেট গ্লোবাল। স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের সামাজিক ও পরিবেশগত উদ্যোগে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংগঠনটির কার্যক্রম পরবর্তী সময়ে বিস্তৃত হয়।
বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলায় ইয়ুথনেট গ্লোবালের নেটওয়ার্ক ও কার্যক্রম রয়েছে। বাংলাদেশের বাইরেও ১৩টি দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে তরুণদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সংগঠনটির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। শুভ বর্তমানে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে তাঁর কাছে সংগঠন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য শুধু তরুণদের একত্র করা নয়। তরুণরা যেন নিজেদের এলাকার সমস্যা নিজেরাই চিহ্নিত করতে পারে, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং সমাধান তৈরির প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিতে পারে—এই ধারণাই তাঁর কাজের কেন্দ্রে রয়েছে।
এই কাজের স্বীকৃতিও এসেছে। তরুণদের সংগঠিত করা এবং সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকার জন্য তাঁদের উদ্যোগ ঝালকাঠি জেলার শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠনের স্বীকৃতি পেয়েছে।
স্থানীয় সমস্যা, স্থানীয় নেতৃত্ব
শুভ মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকটের সমাধান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা জরুরি; কিন্তু এর প্রভাব সবচেয়ে আগে অনুভব করেন স্থানীয় মানুষ। ফলে সমাধানের প্রক্রিয়াতেও তাঁদের অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।
এই ভাবনা থেকেই উপকূলীয় ও নদীবিধৌত অঞ্চলের তরুণদের জলবায়ু সচেতনতা, নেতৃত্ব ও স্থানীয় উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন তিনি।
তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তরুণদের শুধু সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের অংশগ্রহণকারী হিসেবে না দেখে পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা। স্থানীয় পরিবেশগত সমস্যা চিহ্নিত করা, জনসচেতনতা তৈরি, কমিউনিটির মানুষের কথা নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তুলে ধরা এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ পরিচালনায় তরুণদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
মানতা জনগোষ্ঠীর পাশে এক দশক
আরিফুর রহমান শুভর কাজের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে নদীনির্ভর প্রান্তিক মানতা জনগোষ্ঠী।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে নৌকায় বসবাসকারী মানতা সম্প্রদায়ের জীবন নদীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ বাসস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে আছেন।
প্রায় এক দশক ধরে এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন শুভ ও তাঁর সহকর্মীরা। মানতা শিশুদের শিক্ষা, পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা, মানবিক নিরাপত্তা, অধিকার এবং স্থায়ী জীবনমান তৈরির বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন তাঁরা।
শুভর কাছে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী জনগোষ্ঠীগুলোর একটি হয়েও নদীভাঙন, দুর্যোগ, জীবিকার অনিশ্চয়তা এবং পরিবর্তিত প্রাকৃতিক পরিবেশের বড় চাপ বহন করছে এমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
‘চর ইয়ুথনেট’: উন্নয়ন ভাবনার বাস্তব রূপ
কমিউনিটি উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় শুভদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ‘চর ইয়ুথনেট’। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৯৫টি পরিবার বসবাস করছে।
এই উদ্যোগের পেছনে ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কেবল সাময়িক সহায়তার পরিবর্তে তুলনামূলক স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার ভাবনা।
মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, শিশুদের ভবিষ্যৎ, কমিউনিটির সামাজিক নিরাপত্তা এবং জীবনমান—এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে এই উদ্যোগে।
শুভ মনে করেন, উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন যাঁদের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তাঁরাই সেই পরিবর্তনের অংশীদার হন।
স্বেচ্ছাসেবা থেকে মানবিক নেতৃত্ব
শুভর পথচলা শুধু পরিবেশ ও জলবায়ু আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ যুব রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবক সংগঠিত করা এবং নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন তিনি।
দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠিত করার অভিজ্ঞতা তাঁর সামাজিক দায়িত্ববোধকে আরও শক্তিশালী করেছে।
সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝেছেন, মানবিক সহায়তা, জলবায়ু পরিবর্তন, যুব নেতৃত্ব এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার—বিষয়গুলো আলাদা মনে হলেও বাস্তবে একটির সঙ্গে অন্যটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
একটি দুর্যোগ কোনো পরিবারের শুধু ঘরবাড়িই নষ্ট করে না; শিশুর শিক্ষা বন্ধ করতে পারে, মানুষের আয় কমিয়ে দিতে পারে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং একটি পরিবারকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিত