৫নং সুবিদপুর ইউনিয়নের মজুমদার বাড়ি থেকে ফোরকান চেয়ারম্যানের বাড়ি পর্যন্ত সড়কের বেহাল দশা, দুর্ভোগে চার গ্রামের মানুষ
এম কে কামরুল ইসলাম স্টাফ রিপোর্টার
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ৫নং সুবিদপুর ইউনিয়নের মজুমদার বাড়ি থেকে ফোরকান চেয়ারম্যানের বাড়ির দরজা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ৪ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মজকুনী, সুবিদপুর, পূর্ব গোপালপুরসহ আশপাশের গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ২০ বছর আগে সড়কটিতে হেরিংবোন (এইচবিবি) রাস্তার কাজ করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সড়কটিতে আর কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন বা সংস্কারকাজ হয়নি। বর্তমানে সড়কের বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও রাস্তার মাটি ও ইট উঠে গেছে, কোথাও জমে থাকে পানি ও কাদা। ফলে শুকনো মৌসুমে ধুলা আর বর্ষায় কাদায় সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
২০২৩ সালেও হয়েছিল মানববন্ধন, তৎকালীন সরকার ও এমপির নজরে আনার চেষ্টা
সড়কটির দুরবস্থা নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। ২০২৩ সালেও সড়কটি সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য তৎকালীন সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের (এমপি) নজরে আনার উদ্দেশ্যে স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সে সময় তাদের মূল দাবি ছিল—জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দ্রুত সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা এবং বিষয়টি তৎকালীন সরকার ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের নজরে এনে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন বরাদ্দ নিশ্চিত করা। মানববন্ধনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সড়কটির স্থায়ী সংস্কার হয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
ওই মানববন্ধনে তৎকালীন চেয়ারম্যান ফোরকানসহ স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নিয়ে সড়কটির দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—২০২৩ সালেও যদি তৎকালীন সরকার ও এমপির নজরে আনার জন্য মানববন্ধন করতে হয়, তাহলে এত বছর পরও কেন সড়কটির ভাগ্য বদলাল না? মানুষের দুর্ভোগ নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কোথায়—এমন প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটি সংস্কারের জন্য বিভিন্ন সময়ে তালিকাভুক্ত হলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে উন্নয়নকাজের তালিকা থেকে বারবার বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
সড়কটির সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে ১৬১ নম্বর পশ্চিম সুবিদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। বৃষ্টি হলে রাস্তার গর্তে পানি ও কাদা জমে যায়। ফলে স্কুলে যাতায়াত করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়।
স্থানীয়দের দাবি, সড়কের গর্ত ও কাদায় চলাচলের সময় শিক্ষার্থীদের পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে একদিকে যেমন তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়, মজকুনী, সুবিদপুর ও পূর্ব গোপালপুরসহ আশপাশের গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী নলছিটি ডিগ্রি কলেজ, মোল্লারহাট ও বরিশালের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। প্রতিদিন তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক দিয়েই যাতায়াত করতে হয়।
স্থানীয়দের কাছে সড়কটি শুধু যাতায়াতের পথ নয়, এটি তাদের জরুরি যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অসুস্থ রোগীকে নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার সময় সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় স্বজনদের।
অ্যাম্বুলেন্স, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচলেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতেই অতিরিক্ত সময় লাগছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে সড়কটির অবস্থা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিভিন্ন স্থানে পানি ও কাদা জমে থাকায় যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় গ্রামের মানুষ কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
কর্মসংস্থানের কারণে এলাকার অনেক মানুষ দূর-দূরান্তে অবস্থান করেন। তাদের পরিবারের সদস্যদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে তালতলা বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে যেতে হয়। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে বাজারে যাতায়াতেও তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তারা সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। এমনকি ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকার ও স্থানীয় এমপির নজরে আনার জন্য মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেও কোনো স্থায়ী সমাধান পাননি তারা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, ৫নং সুবিদপুর ইউনিয়ন একটি ঐতিহ্যবাহী ইউনিয়ন হলেও ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক বছরের পর বছর এমন বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তাদের প্রশ্ন, জনগণের চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক যদি প্রায় দুই দশক সংস্কারহীন থাকে এবং দাবির পরও সংস্কার না হয়, তাহলে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের দায় নেবে কে?
স্থানীয়রা আরও দাবি করেন, সড়কটি নিয়ে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। পুরোনো এইচবিবি সড়কটি নতুন করে সংস্কার বা উন্নয়ন করে টেকসই সড়কে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।
এ অবস্থায় দ্রুত সড়কটির সংস্কার ও উন্নয়নকাজ শুরু করে জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবি জানিয়েছেন মজকুনী, সুবিদপুর, পূর্ব গোপালপুরসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে